বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রে জন প্রতিনিধিত্ব ও এলাকার উন্নয়নই হলো মূল লক্ষ্য। একজন জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হন জনগণের কথা বলার জন্য, তাদের সমস্যা সমাধানের জন্য। কিন্তু যখন এই প্রতিনিধিত্বের কাঠামোই জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে নিজেদের সুবিধার জন্য পরিবর্তন করা হয়, তখন তা কেবল হতাশাজনকই নয়, গণতন্ত্রের মৌলিক নীতিরও পরিপন্থী। সম্প্রতি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবগঠিত বিজয়নগর উপজেলার অখণ্ডতা নষ্ট করার যে প্রস্তাব উঠেছে, তা এই গুরুতর প্রশ্নগুলো সামনে নিয়ে এসেছে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, বিজয়নগরের তিনটি ইউনিয়ন (চান্দুরা, বুধন্তি, ও হরষপুর) পার্শ্ববর্তী সরাইল-আশুগঞ্জ আসনের সঙ্গে যুক্ত হবে। অথচ এই বিজয়নগর উপজেলা গঠিত হয়েছিল ২০১০ সালে, যখন এই উপজেলা ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদরের অংশ ছিল। নবগঠিত এই উপজেলার ভৌগোলিক, সামাজিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতা বিবেচনায় এনেই এর প্রশাসনিক কাঠামো সাজানো হয়েছিল। এখন যখন জনগণ নিজেদের একটি একক প্রশাসনিক ও সামাজিক কাঠামোর অংশ হিসেবে দেখতে অভ্যস্ত, তখন এই বিভাজন তাদের ঐক্য ও পরিচয়কে বিভক্ত করবে।
বিশ্বের অনেক দেশেই নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণে নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে স্বাধীন কমিশন কাজ করে। কানাডা,যুক্তরাজ্যের মতো দেশে স্বাধীন সীমানা কমিশন রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে কাজ করে, যা পক্ষপাতিত্ব কমাতে সাহায্য করে। বাংলাদেশেও এমন একটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সীমানা পুনর্নির্ধারণ করা জরুরি, যেখানে কেবল জনসংখ্যার সংখ্যা নয়, বরং মানুষের অখণ্ডতা, ঐক্য ও সুবিধা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাবে।
যুক্তি দেখানো হচ্ছে যে, একটি সংসদীয় আসনের জন্য জনসংখ্যাকে ভারসাম্যপূর্ণ করতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। আমেরিকান লেখক ফ্র্যাঙ্ক হার্বার্ট যেমন বলেছিলেন, “মানুষের মন সংখ্যা দিয়ে নয়, প্রতীক দিয়ে কাজ করে (The human mind works with symbols, not with numbers) ।”
কিন্তু জনসংখ্যা গণনার চেয়েও বড় বিষয় হলো মানুষের সুবিধা এবং প্রশাসনিক বাস্তবতা। যেখানে বিজয়নগর উপজেলা থেকে চান্দুরা, বুধন্তি, ও হরষপুর ইউনিয়নের দূরত্ব যথাক্রমে মাত্র ১০, ১৯, ও ২৯ মিনিটের যানবাহনের পথ, সেখানে সরাইল সদরের দূরত্ব ৩০, ৩৪ ও ১ ঘণ্টারও বেশি। ভৌগোলিক এই বাস্তবতা উপেক্ষা করে, কেবল সংখ্যা দিয়ে একটি এলাকার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা যায় না।
জনপ্রতিনিধিদের কাজ হলো জনগণের জন্য কাজ করা, তাদের সুবিধা নিশ্চিত করা। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত যেন জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যা বিজয়নগরের কাছে “মায়ের চেয়ে মাসির দরদ বেশি’র মতো ঠেকছে। জনগণ পরিষ্কারভাবে বলছে, তারা বিভক্ত হতে চায় না। তারা এমন জনপ্রতিনিধি চায়, যিনি তাদের কথা ভাববেন, তাদের এলাকার উন্নয়নের জন্য কাজ করবেন। অন্য উপজেলার একজন জনপ্রতিনিধি নিজ এলাকার উন্নয়নকে প্রাধান্য দেবেন, এটাই স্বাভাবিক। এতে বিজয়নগরের বিচ্ছিন্ন ইউনিয়নগুলো অবহেলার শিকার হবে।
আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, জনপ্রতিনিধিদের উচিত জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং নিজেদের ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থে জনমতকে উপেক্ষা না করা। বিজয়নগরের জনগণের সুস্পষ্ট দাবি হলো তাদের উপজেলাকে অখণ্ড রাখা। এটি শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, এটি একটি এলাকার মানুষের আবেগ ও পরিচয় রক্ষার প্রশ্ন। নির্বাচন কমিশন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আমাদের আহ্বান, জনগণের দাবিকে সম্মান জানিয়ে বিজয়নগরের অখণ্ডতা বজায় রাখুন। জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিলে তা কখনোই ফলপ্রসূ হবে না।
আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন গণতন্ত্রকে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন “জনগণের, জনগণের দ্বারা, জনগণের জন্য সরকার (Government of the people, by the people, for the people)” হিসেবে। যখন সরকার জনগণের সুস্পষ্ট ও বারবার উচ্চারিত ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়, তখন এই সংজ্ঞার মূল চেতনাকে লঙ্ঘন করা হয়। বিজয়নগরের জনগণ বারবার মানববন্ধন, সমাবেশ ও গণশুনানির মাধ্যমে তাদের দাবি জানিয়েছে। তারা বিভক্ত হতে চায় না। তারা এমন একজন জনপ্রতিনিধি চায়, যিনি তাদের কথা শুনবেন এবং তাদের এলাকার উন্নয়নে কাজ করবেন।
শারমীন আক্তার
যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি)








