বাংলাদেশের রাজনৈতিক মঞ্চে সাম্প্রতিক সময়ে ডিম ছোড়ার ঘটনা বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে এটি কোনো নতুন প্রবণতা নয়; বরং বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক ক্ষোভ প্রকাশের একটি পুরোনো এবং প্রতীকী কৌশল হিসেবে ডিমের ব্যবহার হয়ে আসছে। সহজলভ্যতা, সাশ্রয়ী মূল্য এবং এর প্রতীকী তাৎপর্য ডিমকে প্রতিবাদের এক শক্তিশালী মাধ্যমে পরিণত করেছে।
মধ্যযুগে ডিম নিক্ষেপের ইতিহাস পাওয়া যায়, যেখানে বন্দীদের জনসমক্ষে শাস্তি দিতে এটি ব্যবহার করা হতো। তবে রাজনৈতিক প্রতিবাদের হাতিয়ার হিসেবে এর ব্যবহার শুরু হয় আরও পরে। লিখিত নথি অনুযায়ী, ১৮০০ দশকের শুরুর দিকে আয়েল অফ ম্যান দ্বীপে মেথোডিস্টদের ওপর ডিম নিক্ষেপ করা হয়েছিল। এর ধারাবাহিকতায়, ১৮৩৪ সালে মার্কিন দাসত্ববিরোধী বক্তা জর্জ হোয়াইটারকে লক্ষ্য করে ডিম ছোড়ার ঘটনা ঘটে, যা রাজনৈতিক অঙ্গনে এর ব্যবহারের একটি পুরোনো উদাহরণ।
রাজনৈতিক ইতিহাসে ডিম নিক্ষেপের কিছু উল্লেখযোগ্য ঘটনা:
- ১৯১৭ সাল: অস্ট্রেলিয়ার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বিলি হিউজকে জনসভায় ডিম ছোড়া হয়েছিল।
- ২০০১ সাল: ব্রিটেনের উপ-প্রধানমন্ত্রী জন প্রেসকটকে ডিম ছোড়ার পর তিনি পাল্টা ঘুষি দিয়েছিলেন। সেই মুহূর্তের ছবি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল।
- ২০০৩ সাল: ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর নির্বাচনের সময় অভিনেতা আর্নল্ড শোয়ার্জনেগর ডিমের শিকার হয়েছিলেন।
- ২০০৪ সাল: ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভিক্টর ইয়ানুকোভিচ বিরোধীদের ছোড়া ডিমে আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন।
- ২০১৩ সাল: ফরাসি কৃষকরা ইউরোপীয় ইউনিয়নের নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদে রাস্তায় প্রচুর ডিম ভেঙেছিল।
কেন ডিম হয়ে ওঠে প্রতিবাদের মাধ্যম?
কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক অ্যান্ড্রু গেলম্যানের মতে, প্রতিবাদের জন্য ডিম বেছে নেওয়ার কয়েকটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, ডিম অত্যন্ত সস্তা এবং সহজলভ্য, যা যেকোনো বিক্ষোভকারীর জন্য একটি কার্যকর হাতিয়ার। দ্বিতীয়ত, ডিম ফেটে গেলে তা একটি দৃশ্যমান এবং নাটকীয় প্রতিবাদ হিসেবে কাজ করে, যা দ্রুত মানুষের নজর কাড়ে এবং গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এই দৃশ্য প্রতিবাদের উদ্দেশ্যকে সবার কাছে স্পষ্ট করে তোলে।
এছাড়াও, ডিম ছোড়াকে প্রায়শই অহিংস প্রতিবাদ হিসেবে দেখা হয়। পাথর বা অন্য কোনো শক্ত বস্তুর পরিবর্তে ডিম ব্যবহার করলে পুলিশের পক্ষ থেকে পাল্টা কঠোর পদক্ষেপ বা গুলির ঝুঁকি কমে যায়। অধ্যাপক গেলম্যান বলেন, “ডিম বা টমেটো নিক্ষেপ করলে পুলিশের গুলি চালানো জনমনে ‘ফুলিশ’ হিসেবে দেখা দেবে।”
ডিমের মাধ্যমে প্রতিবাদ শুধু ক্ষোভের প্রকাশ নয়, এটি একটি নিরীহ কিন্তু কার্যকর উপায় হিসেবে বছরের পর বছর ধরে ব্যবহৃত হচ্ছে। এটি রাজনৈতিক প্রতিবাদের এক শক্তিশালী এবং প্রতীকী ভাষা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে।








