তিতাস নদীর বুকে ভাসা আমাদের বাউনবাইরা জেলাডা যেন সময়ের সাক্ষী হয়ে দাঁড়াইয়া আছে। সকালের কুয়াশায় মোড়া এই জেলাডার রূপ দেখলে মনে হয় যেন কেউ এক টুকরো ইতিহাস হাতে নিয়ে দাঁড়াইয়া আছে।
বাউনবাইরা জেলাডার নামডা কেমনে আইলো?এস এম শাহনূর সম্পাদিত নামকরণের ইতিকথা থেকে জানা যায় যে, সেন বংশের রাজত্বকালে এই অঞ্চলে অভিজাত ব্রাহ্মণকুলের বড়ই অভাব ছিল। যার ফলে এ অঞ্চলে পূজা অর্চনার জন্য বিঘ্নতার সৃষ্টি হত। এ সমস্যা নিরসনের জন্য সেন বংশের শেষ রাজা লক্ষণ সেন আদিসুর কন্যকুঞ্জ থেকে কয়েকটি ব্রাহ্মণ পরিবারকে এ অঞ্চলে নিয়ে আসেন। তাদের মধ্যে কিছু ব্রাহ্মণ পরিবার শহরের মৌলভী পাড়ায় বাড়ী তৈরি করে। সেই ব্রাহ্মণদের বাড়ির অবস্থানের কারণে এ জেলার নামকরণ ব্রাহ্মণবাড়িয়া হয় বলে অনেকে বিশ্বাস করেন। অন্য একটি মতানুসারে দিল্লী থেকে আগত ইসলাম ধর্ম প্রচারক শাহ সুফী হযরত কাজী মাহমুদ শাহ এ শহর থেকে উল্লেখিত ব্রাহ্মণ পরিবার সমূহকে বেরিয়ে যাবার নির্দেশ প্রদান করেন, যা থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া নামের উৎপত্তি হয়েছে বলে মনে করা হয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আঞ্চলিক উচ্চারণ ‘বাউনবাইরা’।
এছাড়া ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিকৃত নাম ‘বি-বাড়িয়া’ বহুল প্রচলিত। যার ফলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঐতিহ্য ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। এ অবস্থার উত্তরণে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসন হতে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে এবং ২০১১ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসন হতে সকল ক্ষেত্রে বি-বাড়িয়ার পরিবর্তে ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া’ লেখার প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।
একদিন এই জেলাডা জমিদারদের পদচারণায় মুখর হইত। তাদের বড় বড় অট্টালিকায় চলত নাচ-গানের আসর। আজো সেই বাড়ির ভাঙা দেয়ালে, খসে পড়া ইটে লুকাইয়া আছে সোনালি দিনের গল্প। পুরান লোকেরা এখনো গল্প করে:
“জমিদারবাবুদের দিনে তো এখানে রোজ উৎসব চলত…”
বাউনবাইরার বুড়ি মায়েরা এখনো গায়:
“তিতাসের ঢেউ রে ভাই,
কেন আমারে ভাসাইলা
গাঁও ছাইড়া দূর দেশে…”
এই গানের সুরে মিশে আছে শত বছরের বেদনা আর ভালোবাসা।
এখনো বাউনবাইরার মানুষ:
- ভোর না হতেই মাঠে যায় ধান কাটতে
- তিতাসের জলে জাল ফেলে মাছ ধরে
- মাটির চুলায় রুটি বানায়
কিন্তু আগের সেই রঙিন দিন আর নাই।
বাউনবাইরা জেলাডার দর্শনীয় ভ্রমণ স্থান ও ঐতিহাসিক স্থাপনার মধ্যে :
রাধিকা সড়ক,বাউনবাইরা টু বিজয়নগর সড়ক, কেল্লা শহীদ মাজার, আরিফাইল মসজিদ, হরিপুর জমিদার বাড়ি, বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামালের কবর, ধরন্তি হাওর, আবি ফিউচার পার্ক, মেদিনী হাওড় অঞ্চল, তিতাস নদীর ব্রীজ, শ্রীঘর মঠ, জয়কুমার জমিদার বাড়ী ,তিতাসের সেই পুরানো ঘাট, যেখানে একদিন নৌকা ভিড়ত,শ্যাওলা পড়া দিঘির পাড়,তিন পুরুষের দেখা আমগাছ ইত্যাদি।
মুঘল আমলে বাউনবাইরা মসলিন কাপড় তৈরির জন্য বিখ্যাত আছিল। এ জেলাডার বিখ্যাত মিষ্টান্নের মধ্যে ছানামুখী অন্যতম, যা দেশের অন্য কোনহানে তেমন প্রচলন নেই। এছাড়া তালের রস দিয়ে তৈরি আরেকটি মিষ্টান্ন তালের বড়া ও রসমালাই বিখ্যাত। বাউনবাইরা জেলাডা পুতুলনাচ ও তিতাস নদীর নৌকা বাইচের জন্যেও বিখ্যাত।
আমাদের বাউনবাইরা জেলাডা শুধু মাটি-পানির গাঁও নয়, এটা আমাদের আবেগের ঠিকানা। তিতাসের জল যেমন কখনো থামে না, তেমনি এই জেলাডা গল্পও চলবেই আগামীর প্রজন্ম পর্যন্ত। আসুন, আমরা সবাই মিলিয়া আমাদের এই সম্পদ রক্ষা করি।








